সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী যৌবনকালে অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করতেন এবং কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ধর্মীয় চেতনায় প্রভাবিত হয়ে মুসলিম পুনর্জাগরণবাদী হিসেবে পরিচিত হন। মুসলমানদের নবজাগরণ ও দেশমাতৃকার স্বাধীনতা অর্জনই ছিল তাঁর জীবনের লক্ষ্য। এ কারণেই তিনি জাতীয় জাগরণমূলক কাব্য সৃষ্টিতে ছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত এবং কাজী নজরুল ইসলামের পূর্বসূরি। মুসলমানদের অন্ধকারকালে তাঁর কাব্য এবং অনলবর্ষী বক্তৃতা মুসলিম জাতিকে যেমন অনুপ্রাণিত করেছে, তেমনি আলোর পথ দেখিয়েছে। তিনি সিরাজগঞ্জে কৃষক আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তাঁর রচিত গদ্য ছিল সংস্কৃতবহুল এবং কবিতা ক্লাসিক রীতির।
সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী ১৩ জুলাই, ১৮৮০ সালে সিরাজগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। সিরাজগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেছেন বলে নামের সাথে 'সিরাজী' যুক্ত হয়।
তিনিই প্রথম সাহিত্যিক, যিনি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগে কারাদণ্ড ভোগ করেন।
তিনি 'মাসিক নূর' (১৯১৯) ও 'সাপ্তাহিক সুলতান' (১৯২৩) পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
বলকান যুদ্ধের (১৯১২) সময় তুরস্ককে সাহায্য করার জন্য ভারতবর্ষ থেকে মেডিকেল টিম পাঠানো হয়। এ টিমে থেকে তিনি আহত সৈনিকদের সেবা করার জন্য তুরস্কের সুলতান কর্তৃক 'গাজী' উপাধি লাভ করেন।
তিনি ১৭ জুলাই, ১৯৩১ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
ইসমাইল হোসেনের কাব্যগ্রন্থসমূহঃ
'অনল প্রবাহ' (১৯০০): এটি তাঁর প্রথম রচনা যা সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয় এবং ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারের অভিযোগে তার ২ বছরের (১৯১০-১২) কারাদণ্ড হয়।
'স্পেন বিজয় কাব্য' (১৯১৪): এটি স্পেনের সম্রাট রডরিকের সাথে মুসলিম বীর তারেকের সংগ্রাম কাহিনি নিয়ে রচিত মহাকাব্য। এ কাব্যের মাধ্যমে মুসলিমদের অতীত বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস নতুন করে উপস্থাপন করা হয়েছে।
'রায়নন্দিনী' (১৯১৮): বঙ্কিমচন্দ্রের 'দুর্গেশনন্দিনী' উপন্যাসের নায়ক হিন্দু এবং নায়িকা মুসলমান। দুই ধর্মের অবৈধ সম্পর্কের রচনার কারণে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে রচনা করেন 'রায়নন্দিনী'। এর নায়ক মুসলিম এবং নায়িকা হিন্দু। এ উপন্যাসে তিনি দেখান যে, হিন্দু নায়িকা কেদার রায়ের কন্যা স্বর্ণময়ী মুসলিম নায়ক ঈশা খাঁর প্রেমেই পড়েনি, বরং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে বিয়েও করেছেন। 'রায়নন্দিনী' উপন্যাস হিসেবে সফল না হলেও প্রতিক্রিয়া হিসেবে সফল।
ভ্রমণকাহিনি: 'তুরস্ক ভ্রমণ' (১৯১০): এ গ্রন্থে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি তুরস্ক ভ্রমণকালে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন, এ গ্রন্থে সেসবের বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন।
সঙ্গীত গ্রন্থ: 'প্রেমাঞ্জলি' (১৯১৬): এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'গীতাঞ্জলি' কাব্যের প্রতিযোগী হিসেবে রচিত সঙ্গীত গ্রন্থ। 'সঙ্গীত সঞ্জীবনী' (১৯১৬)।